বিশেষ নিবন্ধ: জীবনপ্রবাহের কিছু দিন আসে যা কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা বদলানোর সাধারণ হিসাব নয়, বরং তা জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক একটি মাইলফলক। ৮ আগস্ট আমার জীবনের তেমনই এক চিরস্মরণীয় অধ্যায়। ২০২৪ সালের এই দিনে কারাকক্ষের অন্ধকার ও লোহার গরাদের বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে আমি ফিরে পেয়েছিলাম মুক্তির খোলা বাতাস।
স্মৃতির পাতা উল্টালে ফিরে যেতে হয় ২০২৩ সালের সেই দিনগুলোতে। মানুষের মৌলিক অধিকার, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে চলমান আন্দোলনে তৎকালীন বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই নেমে আসে নিপীড়নের নির্মম কশাঘাত। ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর পরবর্তী হরতাল-অবরোধ কর্মসূচির অংশ হিসেবে রাজপথে অবস্থানকালে, ৫ নভেম্বর বংশাল থানা পুলিশের হাতে আমি গ্রেফতার হই। এরপর শুরু হয় জীবনের এক অন্যরকম অধ্যায়—কারাজীবন।
স্বৈরাচারের বন্দিশালায় দীর্ঘ প্রায় ১০টি মাস কাটাতে হয়েছিল চার দেয়ালের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। সেখানে শারীরিক যন্ত্রণা কিংবা মানসিক চাপ—কোনোটাই কম ছিল না। কিন্তু কারাগারের সেই অন্ধকার ও বৈরী পরিবেশ আমার মনোবলকে এক মুহূর্তের জন্যও ভেঙে দিতে পারেনি। কারণ আমি জানতাম, সত্য ও ন্যায়ের লড়াইয়ের পথ কখনো মসৃণ হয় না। সেখানে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, সহ্যের চরম পরীক্ষা দিতে হয়।
আজ পেছন ফিরে তাকালে অনুধাবন করি, কারাভোগের সেই কঠিন ও নির্মম দিনগুলোতে আমার আসল শক্তি ছিল শুভাকাঙ্ক্ষী ও সহযোদ্ধাদের ভালোবাসা। প্রকোষ্ঠের ওপারে থাকা সহযোদ্ধা, সহপাঠী, পরিবারের সদস্য এবং শুভাকাঙ্ক্ষীরা যেভাবে প্রতিটা মুহূর্তে সাহস যুগিয়েছেন, পরিবারের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন এবং মুক্তির জন্য দোয়া ও চেষ্টা করেছেন—সেই অবদান কোনো ভাষায় লিখে শোধ করা সম্ভব নয়। কারাগারের চার দেয়াল আমাকে থামিয়ে দেওয়ার জন্য তৈরি হলেও, বাইরে থেকে আসা এই ভালোবাসা ও ত্যাগের বারতাই আমাকে ভেতরে আরও বেশি দৃঢ় ও অবিচল রেখেছিল।
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে জামিনে মুক্ত হয়ে যখন আবার স্বাধীন আকাশের নিচে দাঁড়াই, তখন বুঝেছিলাম—শৃঙ্খল কেবল হাত-পায়ের হতে পারে, কিন্তু সত্য ও গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন, তা কখনো বন্দি করা যায় না। কারামুক্তির এই বিশেষ দিনে তাই অন্তরের গভীর থেকে গভীরতম কৃতজ্ঞতা জানাই সেই সকল সহযোদ্ধাদের প্রতি, যারা আমার দুঃসময়ে ছায়ার মতো পাশে ছিলেন।
সংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি। অন্যায়, নিপীড়ন ও স্বৈরাচারের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্র এবং গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার যে মূল লক্ষ্য, সেখানে আমাদের আরও পথ হাঁটতে হবে। ইতিহাস সাক্ষী দেয়—ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের সামনে কোনো অন্ধকারই স্থায়ী হয় না। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সকলকে সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার তৌফিক দান করুন এবং দেশের সকল নির্যাতিত ও কারাবন্দী মানুষের মুক্তির পথ সুগম করুন। জয় হোক মানুষের অধিকার ও গণতন্ত্রের। জয় হোক রাজপথের ঐক্যবদ্ধ Struggles-এর।
— জামাল আহমেদ জেনিন
যুগ্ম-আহ্বায়ক, ঢাকা কলেজ ছাত্রদল (সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও যোগাযোগ সম্পাদক, ঢাকা কলেজ ছাত্রদল)

